চন্দ্র এবং সূর্যের বর্ণবলয়

চাঁদ এবং সূর্যের চতুর্দিকে গোলাকার বৃত্তের সৃষ্টি হয় কেন? (বিজ্ঞান কি বলে?)

★বর্ণবলয় কি?

যারা রাতের মেঘ মূক্ত আকাশ দেখতে ভালবাসেন, দূরবীন বাইনোকুলার অথবা খালি চোখে। মাঝে মধ্যে তাদের চোখে পূর্নিমার চাঁদের চারিদিকে গোল একটি বলয় ধরা পড়ে। এই বলয়টি কখনো ছোট এবং কখনো বেশ বড় আকারের দেখা যায়। একে বলে বর্নবলয়। বিশেষ করে শীতকালে একটু বেশী দেখা যায়,বলে এটি শীতকালীন বর্ণবলয় নামেও পরিচিত। এই বলয়টি কখনো ঘোলাটে সাদা রংয়ের আবার কখনো রংধনূর সাতটা রংয়ের ও দেখা যায়। এই বলয় পূর্ন চাঁদের চেয়ে 10 থেকে 20 গুন বড় হয়। এবং চাঁদকে ঠিক মাঝখানে রেখে এই বলয়টি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

উর্ধবায়ূমন্ডলে ভাসমান বরফকনার উপরে চাঁদের আলো প্রতিফলিত হয়ে এই বলয়ের সৃস্টি করে।আর এই বরফ কনা গূলো থাকে মেঘের ভিতরে।এই বলয় একটি নির্দিষ্ট কোণে মেঘের নীচের অংশে প্রদর্শিত হয়।

আমরা যখন দিনের আকাশে সূর্য এবং রাতের আকাশে চাঁদ এর দিকে তাকাই তখন প্রায়ই তাদেরকে একক অবস্থানে দেখি। কিন্তু কখনও লক্ষ্য করলে দেখা যায় সূর্য এবং চাঁদ একাই নেই, তাদের চারপাশে ঘিরে একটি উজ্জ্বল বলয়ের মতো একটি অংশ রয়েছে। এটি মুলত পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের উপরস্থ অংশে থাকা বরফ স্ফটিকে সূর্য বা চাঁদের আলোর প্রতিসরণের কারনেই এটি ঘটে থাকে। এর নাম 22° halo। এই বলয়টি আমাদের দৃস্টি পথের সাথে 22 ডিগ্রী কোন করে থাকে। এই মেঘের দূরত্ব চাঁদ থেকে একই থাকে।বরফের এই বর্ণ বলয় বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন 5-10 কিঃমিঃ (3-6 মাইল) উপরে ট্রস্পফিয়ারে সাইরাস মেঘের ভিতরে থাকা বরফের কনা দিয়েও এই বলয় গঠন হতে পারে।অবশ্য এর জন্য নির্দিষ্ট স্ফটিক আকৃতি এবং স্থিতিবিন্যাসের প্রয়োজন। এই বরফ স্ফটিক দ্বারা আলো প্রতিফলিত এবং প্রতিসৃত হয়ে বিভিন্ন বর্ণে বিভক্ত বিচ্ছুরত হয়। এই স্ফটিক আয়নার মত আচরণ করে এবং সূর্যের আলোকে এই ভাবে প্রতিফলিত করে যার ফলে আমরা এই রকম বলয় দেখতে পাই। চাঁদ এর চারপাশে যখন একে দেখা যায় তখন বলা হয় #Moon_halo বা #Lunar_halo.

 

What makes a halo around the sun or moon? | kiranvoid

চিত্র(১): Moon halo

 

আর সূর্যের চারপাশে দেখা গেলে বলে #Sun_Halo.

Sun halo

চিত্র(২): Sun halo

এটি একটি অপটিক্যাল ইল্যুশন। 22° halo বলার কারণ হলো, আমরা সূর্য বা চাঁদের চারপাশে যে বলয়টি দেখি তার ব্যাসার্ধ থাকে গড়ে ২২°। উল্লেখ্য, কৌণিক ব্যাসার্ধ এটি। উদাহরণ স্বরুপ, আমরা সূর্যকে বা চাঁদকে আকাশে কতোটুকু বড়ো দেখি তা সচরাচর সবারই ধারণা আছেই। সূর্যের গড় কৌনিক ব্যাসার্ধ ০.২৬৭° ও চাঁদের ক্ষেত্রে তা ০.২৫৯°। এবার তাহলে নিশ্চয় ধারণা করতে পারছেন ২২° ব্যাসার্ধ কতো বড়ো হবে?

★বলয়টি সৃষ্টির কারণ কি?

এই বলয়ের সৃষ্টি হয় কিভাবে সেদিকটা দেখা যাক৷ আকাশের দিকে তাকালে আমরা ভিন্ন ধরণের ও রুপের মেঘ দেখতে পাই। মেঘগুলোকে একই উচ্চতায় দেখতে মনে হলেও তারা মোটেই কিন্তু একই উচ্চতায় নেই। সাধারণত গড়ে সর্বনিম্ন স্তরের মেঘও ৬৫০০ ফুট উচ্চতায় থাকে। আবার সর্বোচ্চ প্রায় ১৮ কি.মি উচ্চতা পর্যন্ত মেঘের আনাগোনা দেখা যায়। এরমধ্যে ৬-১০ কি.উচ্চতায় যে মেঘ থাকে তাদের বলা হয় সিরাস মেঘ বা cirrus cloud। কিন্তু আমরা এদের দেখতে পাই না। এ মেঘের বৈশিষ্ট্য হলো এতে মিলিয়ন মিলিয়ন সংখ্যক ক্ষুদ্র বরফ স্ফটিক থাকে, এরা খুবই হালকা ও সাদা বর্ণের। তবে এ স্ফটিকগুলো সম্পূর্ণ গোলাকৃতির হয় না।

অনেক ভিন্ন আকৃতির। কলাম, বুলেট, প্লেট ইত্যাদি। অর্থ্যাৎ হেক্সাগোনাল বা ষড়ভুজাকৃতির৷ এরা খুবই ক্ষুদ্র আকারের হওয়ায় দেখতে পাই না আমরা। আমরা জানি, চাঁদের আলো তার নিজস্ব আলো না, বরং সুর্য থেকে প্রতিফলিত হওয়া আলো। এ আলো প্রতিফলিত হয়ে যখন পৃথিবী বায়ুমন্ডলের ভেতর দিয়ে আসতে থাকে তখন কিছু ঘটনা ঘটে। ধরুন, আপনি এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে চাঁদ দেখছেন সে জায়গায় আপনার উপর সিরাস মেঘের অবস্থান নেই৷ তাহলে আপনি সে বলয় দেখতে পাবেন না। কিন্তু যদি এ অবস্থায় সিরাস মেঘ থাকে তবে চাঁদ থেকে আসা আলো সিরাস মেঘে থাকা সে হেক্সাগোনাল আকৃতির স্ফটিকে যখন প্রবেশ করে তখন একবার প্রতিসরিত হয় এবং নির্গত হওয়ার সময় আরেকবার প্রতিসরিত হয়। এই দুইবার প্রতিসরণে আলো তার সোজা গতিপথ থেকে মোট ২২° কোণে আলো বেঁকে যায়।

ষড়ভূজাকার স্ফটিকে আলোর প্রতিসরণ

চিত্র(৩): ষড়ভূজাকার স্ফটিকে আলোর প্রতিসরণ

আমাদের অবস্থান স্বাপেক্ষে স্ফটিকগুলোর কৌণিক অবস্থান এমন বিন্যাসে থাকে যে সে জায়গার সমস্ত স্ফটিক একই কোণে আলোকে প্রতিসরিত করায় তা চতুর্দিকে ২২° কৌনিক ব্যাসার্ধে একটি আলোকীয় বলয় সৃষ্টি করে যা আমরা দেখতে পাই।

মুন হ্যালো সৃষ্টির প্রক্রিয়া

চিত্র(৪): মুন হ্যালো সৃষ্টির প্রক্রিয়া

★বলয়ের প্রকৃতিঃ

লক্ষ্য করলে দেখবেন, বলয়টির ভেতরের অংশে লাল রং ও বাইরের দিকে থাকে নীল রং। কারণ, লাল রঙ ও নীল রঙের বিচ্যুতি কোণ সমান না। এক্ষেত্রে স্ফটিকে আলো প্রতিসরণের সময় লাল আলো গড়ে ২১.৫৪° কোণে এবং নীল আলো ২২.৩৭° কোণে বেঁকে যায়। তাই লাল আলো থাকে ভেতরে ও নীল আলো থাকে বাইরের দিকে। এ হিসেবে বলয়টির গড় কৌনিক ব্যাসার্ধ থাকে ২১.৮৪° বা প্রায় ২২°।

আবার ৪৬ ডিগ্রী ব্যসেরও বর্ণবলয় দেখা যায়, তবে সেটা খুবই খুবই নগন্য। যখন দিগন্ত হতে সূর্যের উচ্চতা ১৫-২৭ ডিগ্রী থাকে তখন ৪৬ ডিগ্রী ব্যাসের বর্ণবলয় সৃষ্টি হয় যা ২২ ডিগ্রীর তুলনায় দ্বিগুন বড়ো। এতো বড়ো হওয়ার কারণ, তখন আমাদের স্বাপেক্ষে সুর্যের আলো তখন স্ফটিকে বেশি কোণে পতিত হয় ও প্রতিসরিত হয় আরও বেশি কোণে। তাই সৃষ্ট বলয়টির ব্যাসার্ধও বেশি হয়।

২২° ও ৪৬° হ্যালো সৃষ্টির প্রক্রিয়া

চিত্র(৫): ২২° ও ৪৬° হ্যালো সৃষ্টির প্রক্রিয়া

আরও খেয়াল করলে দেখবেন, বলয় সংলগ্ন আকাশ অন্যান্যদিকের তুলনায় বেশি কালো দেখায়। বলয়টির ভেতরের কিনারা সংলগ্ন অংশ বেশ সুস্পষ্ট এবং বাইরের দিকটা ক্রমেই বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছে।

★বর্ণবলয় দেখা যাওয়ার সময়কালঃ

এমন বলয় কতোবার ও কখন সৃষ্টি হয় তার কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। পুর্বেই বলেছি এর জন্যে দায়ী সিরাস মেঘ। সুতরাং, আপনি যে জায়গা থেকে চাঁদ বা সুর্যকে দেখছেন সে স্থানের উপর সিরাস মেঘ কেমন পরিমাণে ও কেমনভাবে বিন্যস্ত আছে তার উপর নির্ভর করবে বলয়টি সৃষ্টি হবে নাকি হবে না এবং এতে আপনি বলয়টি দেখবেন, নাকি দেখবেন না। তবে সচরাচর গড়ে প্রতিবছরে ১০০ দিনে এমন বলয়ের দেখা মেলে।

.

#ধন্যবাদ

.

.

#Jharnakhatun

#jbinteisha


Jharna Khatun

19 Blog posts

Comments