বিরাম চিহ্ন

বিরাম চিহ্নের সঠিক ব্যবহার ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ?


বিরাম চিহ্ন কি, তা আমরা ছোটবেলায় সবাই খুব ভাল করে পড়াশুনা করে পরীক্ষার খাতায় লিখে বড় হলেও এর ব্যবহারটা এখন আমরা অধিকাংশই সঠিকভাবে করিনা। অথচ আমাদের পড়াশুনার মূল উদ্দেশ্য শুধুমাত্র পরীক্ষায় পাশ করা ছিল না; ছিল ব্যবহারিক জীবনের জন্য জ্ঞান অর্জন করা।

বিরাম চিহ্ন আসলে কেন ব্যবহার করা হয়? আমরা যখন কারো সাথে সরাসরি কথা বলি তখন বিভিন্ন পরিস্থিতির কথার সাথে আমাদের চেহারাতে অনুরূপ অভিব্যক্তি/প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। যা আমাদের মনের ভাবকে উত্তমরুপে কথামালার মাধ্যমে প্রকাশ করতে এবং অপরের কাছে সহজবোধ্য করতে সহযোগীতা করে। এখন ধরুন, আপনি আপনার মনের ভাব মুখে উচ্চারন না করে লিখে প্রকাশ করবেন; সেক্ষেত্রে কিভাবে আপনার কথাগুলোর মধ্যে আপনার মনের প্রকৃত পরিস্থিতি ফুটিয়ে তুলবেন? আর যদি আপনি আপনার মনের ভাব সম্পূর্ণরূপে অপরকে বোঝাতেই না করতে পারেন তবে আপনার কথা বলার প্রকৃত উদ্দেশ্য কি আসলে সিদ্ধি হবে? সম্ভবত না। এজন্যই মূলত বিরাম চিহ্ন ব্যবহারের প্রচলন শুরু হয়েছে।

মূলত বিরাম বলতে বিশ্রাম/বিরতি বোঝায়, যা আপনার মনের কথাগুলোর ধরন অনুযায়ী লেখার মাঝখানে বা শেষে প্রয়োজনীয়তা অনুসারে ব্যবহৃত হতে পারে। একে আবার যতি বা ছেদ চিহ্নও বলা হয়। সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাতে শুধুমাত্র দুটি বিরাম চিহ্ন ব্যবহৃত হত। একটি(।) এবং দুটি(।।) দাড়ি। একটাতে বোঝানো হতো অর্ধ বিরতি, আরেকটা পূর্ণ বিরতি।
পরবর্তীতে স্যার ঈশ্বরচন্দ্র ওরফে বিদ্যাসাগর বাংলা ভাষাতে অনেকগুলো যতি/ছেদ/বিরাম চিহ্ন যুক্ত করেন। যেগুলো আমরা প্রায় সবাই-ই কম বেশী জানি। তাই আজ সেগুলোর বিশদ বিবরণ এবং কোনটা কোথায় ব্যবহার করতে হয় তা নিয়ে আলোচনা করব না। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে গুরুত্বহীনতায় আমাদের অধিকাংশই সেই বিরাম চিহ্নের ব্যবহার সঠিকভাবে করিনা। তাই আজকের এই লেখাটি শুধুমাত্র এটা স্বরণ করার জন্য যে, বিরাম চিহ্নের ব্যবহার আমাদের জন্য সত্যিই অনেক জরুরী।

বিরাম চিহ্ন, কখনো কখনো কিছু শব্দের ব্যবহারও কমিয়ে দেয়।  যেমনঃ পৃথিবী মানে ধরনী বা অবনী বা ধরিত্রী......। এভাবে আপনি যদি প্রতিটি শব্দের পর 'বা' না লিখে '/' চিহ্নটি ব্যবহার করেন তবে একদিকে যেমন লেখার সৌন্দর্য বাড়বে, অন্যদিকে তেমন আপনার সময় ও শ্রম কম নষ্ট হবে এবং বাক্যটি অপর ব্যক্তির নিকটও কোন প্রকার অর্থের বিকৃতি ছাড়াই সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হবে। পুনঃরায় লক্ষ্যণীয় যে, 'ইত্যাদি' লেখার স্থলে '.....' ব্যবহার করায় 'ইত্যাদি' শব্দটির ব্যবহার ছাড়াই সকলেই বুঝতে পারবে এর পর আরো অনেক কিছু থাকতে পারে।

আবার কখনো বিরাম চিহ্নের ভুল ব্যবহার অর্থের বিকৃতি ঘটায়। তাই এই বিষয়টিও লক্ষ্য রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যেমনঃ "আপনি কাল আসবেন না আসলে আপনার সাথে কথা নেই।" এখানে প্রথমত বিরাম চিহ্নের ব্যবহার না করায় কথাটি আসলে কেমন হবে সেটা বোঝা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এখানে দুটি বাক্য গঠিত হতে পারে; একটি নেতিবাচক, আরেকটি ইতিবাচক। খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটা 'হ্যাঁবোধক', আরেকটি 'নাবোধক।' এই দুটি বাক্যের যেটা আপনি অন্যকে বোঝাতে চান তা একান্তই নির্ভর করবে আপনি কোথায় যতিচিহ্ন ব্যবহার করছেন তার উপর। যদি আপনি বিরামচিহ্নের সঠিক ব্যবহারে উদাসীন হন তবে এর কারনে কোন গুরুত্বপূর্ণ জায়গাতে হতে পারে চরম ভুল বোঝাবুঝি।

যেমনঃ ধরুন, এই বাক্যটিতে আপনি বোঝাতে চেয়েছেন, "আপনি কাল আসবেন না, আসলে আপনার সাথে কথা নেই।" কথাটিতে সুস্পষ্টতই আপনার নিষেধাজ্ঞা প্রকাশ পেয়েছে। অর্থাৎ বাক্যটি নেতিবাচক ছিল। কিন্তু যদি আপনি কোনরকমে শুধুমাত্র একটি কমার ভুল ব্যবহার করেন তবে বাক্যটির অর্থ সম্পূর্ণরূপেই বদলে যাবে। যেমনঃ "আপনি কাল আসবেন, না আসলে আপনার সাথে কথা নেই" এর মাধ্যমে আপনার অন্যকে বলার জন্য যে কথা ছিল তা কিন্তু সম্পূর্ণরুপেই বিপরীতার্থকভাবে পালটে গেছে। অর্থাৎ নেতিবাচক বাক্যটি ইতিবাচকে বদলে গেছে। তাই বিরামচিহ্নের ব্যবহারে আমাদের অত্যাধিক যত্নবান হওয়া উচিত। যাতে আপনার মনের প্রকৃত যে কথাটি আপনি অন্যের কাছে প্রকাশ করতে চান, তা সম্পূর্ণরূপে আপনার বিপরীতপক্ষকে বুঝতে পারে। আপনার লেখাগুলো যেন এমন প্রাঞ্জল হয়, যাতে অন্যজন যখন পড়বে তখন যেন মনে করে সে আপনার সাথে সরাসরিই কথা বলছে।

আপনি যখন কোন উপন্যাস বা গদ্য বা পদ্য পড়বেন, দেখবেন প্রতিটি লেখকই তার লেখায় উত্তমরুপে বিরামচিহ্নের ব্যবহার করেছেন। যার কারনেই তাদের যেকোন লেখা পড়ে আপনি হাসতে পারেন, কাঁদতে পারেন বা রাগান্বিত হতে পারেন। কারন, আপনি উক্ত লেখকের লেখাটি সম্পূর্ণরূপে বুঝতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিটি জ্ঞানী মানুষই তার মনের ভাব অন্যের কাছে উত্তমরূপে উপস্থাপন করতে পারলে তবেই পূর্ণাঙ্গ তৃপ্তি পান। অন্যথায় তার মনের ভিতরে প্রশান্তি আসেনা। তাছাড়াও, বিরাম চিহ্নের উত্তম ব্যবহার আপনার জ্ঞানের পরিধিও উপস্থাপন করে বটে। কারণ, সকল জ্ঞানী ব্যক্তিই কখনো তার কথা বার্তায় উদাসীনতা অবলম্বন করে না। অন্যের ভুল খোজার আগে সর্বপ্রথম তারা নিজের লেখা-ই বারংবার পড়ে দেখে কোথাও কিছু ভুল আছে কিনা বা তার মনে লালিত বিষয়বস্তু পূর্ণাঙ্গরুপে উপস্থাপিত হয়েছে কিনা। একমাত্র কথার মাধ্যমেই প্রকাশ পায় আপনার ব্যক্তিত্ব, আপনার জ্ঞান! আর বিরামচিহ্ন এক প্রকার হাতিয়ার যা দিয়ে আপনি আপনার লেখার মধ্যে আপনার উচ্ছ্বাস, আবেগ, অনুভূতি সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ করতে পারেন।

বর্তমানে এটাই বড় সত্য যে, আমরা অধিকাংশই এ ব্যাপারে ভীষণ উদাসীন। যেকোন বিষয় লেখনীর মাধ্যমে উপস্থাপনে ভুল করায় ছোটখাট বিষয়েও অনেক বড় ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে, যা কারোরই কাম্য নয়। অনেক জায়গাতেই বিরাম চিহ্নের ভুল ব্যবহার চোখে পড়ে, যা সত্যিই খুব হতাশাজনক। কখনো কখনো তো '।' স্থলে কেউ '?' ব্যবহার করেন। আচ্ছা, তখন পাঠক আপনার লেখাটি ঠিক কিভাবে নিবে?

ধরুন, আপনি কাউকে বলছেন, 'সে ভাত খেয়েছে' এখানে যদি শেষে '।' ব্যবহার করেন তবে আপনি কাউকে একটি তথ্যের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন যে, 'সে ভাত খেয়েছে।' এর মানে আপনি তথ্যটি জানেন। কিন্তু আপনি যদি '?' ব্যবহার করেন, 'সে ভাত খেয়েছে?' এখানে আপনি কারো কাছে তথ্যটি জানতে চাচ্ছেন; তার মানে আপনি তথ্যটি জানেন না। তাহলে দেখুন শুধুমাত্র একটি বিরাম চিহ্নের ব্যবহার আপনার কথাটির পুরো অর্থই কতটা ভিন্নভাবে বদলে দিচ্ছে।
তাই আমরা সবাই যতিচিহ্নের ব্যবহারে অনেক সচেতন হবো, আর খুব সাধারন ভুলত্রুটিকে অসাধারন সমস্যা অব্দি গড়ানো থেকে অবশ্যই নিরাপদ থাকার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ্‌। এমনটাই আশা রাখছি।

আসলে জীবনের প্রয়োজনে আমাদের মাঝে মাঝে আবার ছোটবেলাতে ফিরে যেতে হয়। কারণ, ছোটবেলার শিক্ষাগুলো কাজে লাগিয়েই আমাদেরকে আজীবন পথ চলতে হয়। তখনকার সময়কাল ছোট হলেও শিক্ষাগুলো কিন্তু মোটেও ছোট ছিল না। সেগুলো সব বয়সের জন্যই মূল্যবান ছিল। তাইতো আজ বড় বেলায়ও সে শিক্ষাগুলো খুব প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, ফিরে যেতে হয় কখনো আবার সেই ছোট ছোট শিক্ষাগুলো পুনঃচর্চা করতে।

 

অসংখ্য ধন্যবাদ।

"বিনীতা #JharnaKhatun"


Jharna Khatun

19 Blog posts

Comments