মন্দা সিজনে পরিবারসহ সেন্টমার্টিন ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

Comments · 30 Views

আমরা ১০০০ টাকা প্রতিদিনের ভাড়া হিসাবে একটি কাপল রুম নিলাম দুইদিনের জন্য যেটির ভাড়া সিজনে ৩৫০০ টাকা

গত বৃহস্পতিবার ২১ শে এপ্রিল বিকাল সাড়ে পাঁচটায় ঐদিনই পরিবারসহ সেন্টমার্টিন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। যেহেতু চট্টগ্রাম/কক্সবাজার/টেকনাফ কোন জায়গা থেকেই এখন সেন্টমার্টিনে শিপ যাচ্ছে না তাই আমরা আগেই জানতাম যে আমাদেরকে টেকনাফ থেকে ট্রলার বা স্পিডবোটে যেতে হবে। প্রথমেই বাসা থেকে সরাসরি ব্যাগপত্র নিয়ে গাবতলী গিয়ে বাস কাউন্টারগুলোতে টেকনাফগামী বাসের টিকেট এর খোঁজ করি কিন্তু আমাদের পৌঁছাতে দেরী হয়ে যাওয়ায় দেখলাম ৬ টার মধ্যেই নামকরা সব অপারেটরের টেকনাফগামী রাতের একমাত্র ট্রিপগুলো ছেড়ে দিয়েছে। শেষে এক অখ্যাত এবং অপেক্ষাকৃত নতুন অপারেটরের এসি বাসের টিকেট নিলাম কক্সবাজার পর্যন্ত। অশোক লেল্যান্ড ব্র্যান্ডের এসি বাস ছিল এবং ভাড়া ছিল ৮০০ টাকা (দরাদরি করে নেওয়া)।
 
আমার মত ছ'ফুট লম্বা ব্যাক্তির জন্য বাসে লেগস্পেস কম ছিল (হিনো 1J বাসের থেকেও কম)। অখ্যাত কোম্পানী হওয়ায় এরা রাস্তা থেকে যাত্রী তুলছিল যা ছিল বিরক্তিকর এবং এদের ঢাকা থেকে কক্সবাজার আসতে ১০ ঘন্টা লেগেছিল। পরে আমি হিসাব করে দেখেছিলাম যে আসলে বাস বেশ ভাল স্পিডে এসেছিল, দেরি মূলত এরা রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী নিয়ে আর ৪-৫ টা যাত্রাবিরতির কারণে করেছিল। সকাল সোয়া ৭ টার দিকে আমরা কক্সবাজারের লিংক রোডে নেমে যাই। নেমেই সাথে সাথে টেকনাফগামী গেইটলক পালকি পরিবহনের একটি বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। জনপ্রতি ১৭০ টাকার টিকেট কেটে বাসে উঠে বসার মোটামুটি পৌনে ঘন্টার মধ্যে টেকনাফ পৌঁছে যাই। বাস থেকে নেমে জনপ্রতি ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে লোকাল অটোতে টেকনাফ ট্রলার ঘাটে পৌঁছে যাই।
 
টেকনাফ ব্রীজের নিচে ট্রলার ঘাট থেকেই সেন্টমার্টিনগামী ট্রলার এবং স্পিডবোট ছাড়ে। ট্রলারের ভাড়া জনপ্রতি ২৫০ টাকা এবং সময় লাগে ৩ ঘন্টা আর স্পিডবোটের ভাড়া জনপ্রতি ৭২০ টাকা এবং সময় লাগে ৪৫ মিনিট। আমরা ব্যাগে করে ছাতা নিয়ে এসেছিলাম যাতে ট্রলারে গেলে রোদ থেকে বাঁচতে পারি কারণ আমি জানতাম যাত্রী না পেলে স্পিডবোট সবসময় ছাড়ে না। কিন্তু আমরা গিয়ে দেখলাম ঘাটে আরো কয়েকজন অপেক্ষা করছে স্পিডবোট ছাড়ার। আমরা ঘাটে পৌঁছানোর আধাঘন্টার মধ্যেই আরও কয়েকজন আসায় স্পিডবোট ছেড়ে দিল। জীবনে তৃতীয়বারের মত এই থ্রিলিং স্পিডবোট যাত্রা শুরু করলাম। এখানে বলে রাখি যে একদমই লুতুপুতু বাচ্চা এবং মহিলারা (কিছু পুরুষেরাও এই দলে থাকতে পারেন) যারা খুব আরামপ্রিয় আর ভীতু তারা এই স্পিডবোটে উঠা থেকে শুরু করে সেন্টমার্টিন পৌঁছান পর্যন্ত খুবই অস্বস্তিতে থাকতে পারেন কারণ এই স্পিডবোট গুলো মূলত লোকাল লোকজন ব্যবহার করে এবং তারা সিট নেওয়া থেকে শুরু করে তাদের ভারি গাট্টি বস্তা লোড করা নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। আমরা যারা এই ধরনের যাতায়াতে অনভ্যস্ত তারা ঘাবড়ে যেতেই পারি। এছাড়াও প্রায় সব স্পিডবোট সিট সংখ্যার থেকে অতিরিক্ত ২০%-৩০% যাত্রী নেয়। নাফ নদী থেকে মূল সাগরে বের হওয়ার পর স্পিডবোটে ঢেউয়ের ধাক্কার দুলুনি অনুভূত হয়। এতে করে দূর্বলচিত্ত আর অনভ্যস্ত যে কেউ ভয় পেতে পারেন। যদিও আমি মনে করি সাগর শান্ত থাকলে আর আকাশ পরিস্কার থাকলে ভয়ের তেমন কিছু নাই। যাইহোক ৪৫ মিনিটের মধ্যে আমরা সেন্টমার্টিন জেটিতে নেমে যাই।
 
জেটিতে নামার পর আমি আমার স্ত্রী এবং বাচ্চাকে নিয়ে ব্যাগপত্রসহ বাজারে হেঁটে আসি এবং একটি দোকানের সামনে বেঞ্চে তাদেরকে ছায়ায় বসাই। যেহেতু বৈশাখ মাসে দ্বীপে রোদের তীব্র তাপ থাকে এবং আমরাও একটি অনেক বড় জার্নি করে এসেছি স্বভাবতই ক্লান্ত ছিলাম। যাইহোক তাদেরকে বাজারে বসিয়ে আমি একা রিসোর্ট দেখতে চলে যাই। ঢাকা থেকেই আমি ৩ টি রিসোর্টের সাথে কথা বলে এসেছিলাম যে তারা খোলা আছে কিনা। পশ্চিম বিচে হওয়ায় সেগুলোতে আমি অটোতে করে গেলাম। যে অটো ভাড়া সিজনে ২০০ টাকা থাকে (বাজার থেকে অবকাশ পর্যন্ত) তা ২০ টাকায় গেলাম। দুইটি রিসোর্ট ঘুরে দেখে নোনাজল বিচ রিসোর্টে উঠলাম। রমজান মাস হওয়াতে সেন্টমার্টিনের দ্বীপের সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ ছিল এবং বেশীরভাগ রিসোর্টও বন্ধ ছিল। আমাদের রিসোর্টে আমরাই একমাত্র বোর্ডার ছিলাম এবং পুরো দ্বীপে ওইদিন আমার জানামতে আমরা ছাড়া ১০ জন ব্যাচেলরের একটি দল ছিল মাত্র, বাকী সবাই লোকাল অধিবাসী।
 
নোনাজল রিসোর্ট বীচের একদম সাথে এবং কেয়ারটেকার ইমান শরীফের ব্যবহার খুবই ভাল। আমরা ১০০০ টাকা প্রতিদিনের ভাড়া হিসাবে একটি কাপল রুম নিলাম দুইদিনের জন্য যেটির ভাড়া সিজনে ৩৫০০ টাকা প্রতিদিন। যেহেতু দ্বীপের সব রেস্টুরেন্ট বন্ধ তাই আমরা ঠিক করলাম রান্না করে খাব। ইমান শরীফ আমাদের জন্য রিসোর্টের রান্নাঘর খুলে দিলেন যেখানে সিজনের সময় বাবুর্চি গেস্টদের জন্য রান্না করে। আমি কেয়ারটেকারকে রুম রেডি করতে বলে বাজারে গিয়ে আমার ফ্যামিলিকে অটো দিয়ে রিসোর্টে নিয়ে আসলাম। আসার সময় চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, ডিম, কাঁচামরিচ আনলাম বাজার থেকে রান্না করার জন্য (টোটাল ৩০০+ টাকার বাজার)। সবরকম মসলা আমরা ঢাকা থেকেই নিয়ে গেছিলাম ছোট ছোট কাগজের প্যাকেটে করে।
 
রিসোর্টে এসে দেখি রুম রেডি। আমরা স্নান করে ফ্রেশ হলাম এবং ঢাকা থেকে নিয়ে যাওয়া ম্যাগি ইন্সট্যান্ট নুডলস ৫ মিনিটে বানিয়ে খেলাম। এরপর সবাই একটি ছোট করে ঘুম দিলাম। এরপর বিকালে ইফতারের আগে আগে আবার জেটিতে গিয়ে কিছু ইফতার আইটেম কিনে খেয়ে দ্বীপটার উত্তর বীচ ঘুরে দেখলাম। ইফতারের পর অন্ধকার হয়ে গেলে রিসোর্টে ফিরে এলাম। আমার স্ত্রী খিচুড়ি আর ডিম ভাজা বানালো রাতে ডিনারের জন্য। তিনজনে ডিনার করে ঐদিনের মত ঘুমিয়ে গেলাম।
 
পরদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হল কিছুটা। ৯ টার দিকে উঠে আগের দিনের থেকে যাওয়া খিচুড়ি দিয়ে, আবার ডিম ভাজা করে খেয়ে নিলাম। এরপর রিসোর্টের চমৎকার মাচাটাতে বসে দারুণ সমুদ্রের হাওয়া আর ঢেউ উপভোগ করলাম ঘন্টা খানেক তিনজন। পুরা বীচ ফাঁকা। এত দারুণ নীরব পরিবেশ কখনোই সিজনে যখন ৪-৫ টি জাহাজ চলে তখন পাওনা সম্ভব নয়। তখন পুরো সেন্টমার্টিন বাজার হয়ে উঠে আর পর্যটকদের সাথে সবাই গলাকাটা ব্যবসা করে। যাইহোক বেলা ১১ টার দিকে গিয়ে তিনজন সমুদ্রে নামলাম এবং ফাঁকা বীচে জলকেলি করে স্নান করলাম। এরপর রুমে এসে আবার রান্নার আয়োজন করলাম। ভাত, আলুভর্তা, ডিমের ঝোল আর ডাল। রান্নার পরে খেয়ে আবার জেটিতে গেলাম মাছ কিনতে। মাছ কিনতে গিয়ে দেখি ডাব বিক্রি হচ্ছে ইফতারের আগমূহুর্তে। ৩৫ টাকা পিস দরে বড় সাইজের দুটো ডাব খেলাম আমরা। জেটিতে বিকালের দিকে নানা ধরনের টাটকা সামুদ্রিক মাছ কিনতে পাওয়া যায় যা লোকালরাই কেনে। আমি ৪০০ টাকা কেজি দরে ১ কেজি লবস্টার (৭ পিস) এবং ২৫০ টাকা কেজি দরে ১ কেজি সুন্দরী পোয়া (৪ পিস) কিনলাম (মোট ৬৫০ টাকা)। আমাকে স্থানীয় লোকজন বলেছিল সিজনে এই মাছগুলো কিনতে ৩০০০ টাকার উপরে লাগত। মাছ ভাজার পর খেয়ে অভিভূত হয়ে গেছিলাম আমরা এত সুস্বাদু ছিল মাছগুলো। আসলে এমন মজার মাছ শেষ কবে খেয়েছি মনে নাই। এইরকম তাজা সামুদ্রিক মাছ ঢাকায় পাওয়া অসম্ভব। রাতে রিসোর্টে ফেরার আগে একটি অটো ঠিক করলাম পরদিন ভোরে ছেঁড়াদ্বীপ যাওয়ার জন্য। যাওয়া-আসা ৪৫০ টাকায় রফা হলো।
 
পরদিন আমরা ভোর ৫ টায় উঠলাম। কারণ আমাদের অটো ৬ টার মধ্যে ছেঁড়াদ্বীপ যাওয়ার জন্য নিতে আসবে। তাছাড়া ছেড়াদ্বীপ ঘুরে এসে আমরা আজকে ১১ টার মধ্যে টেকনাফের স্পিডবোট ধরব। পৌনে ৬ টার মধ্যে আমরা ছেঁড়াদ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম। যেতে লাগল ৩৫ মিনিট, এরপর ছেঁড়াদ্বীপে ঘুরলাম দেড়-দুই ঘন্টা, এরপর আসতে লাগল ৪০ মিনিটের মত। সত্যি বলতে কি সেন্টমার্টিন মূল দ্বীপটার সৌন্দর্য এখন আর নেই তেমন যদি আমি আমার ৯ বছর আগের দেখা সেন্টমার্টিনের সাথে তুলনা করি। প্রচুর ময়লা আবর্জনা, অপরিকল্পিত হোটেল রিসোর্ট, লোকালদের কথায় কথায় ব্যবসায়ীক মনোবৃত্তি মূল দ্বীপের সৌন্দর্য নস্ট করেছে অনেকাংশে। যা দেখার আছে এখনও একটু তা হল এই ছেঁড়াদ্বীপ। যদিও ছেঁড়াদ্বীপেও প্লাস্টিক জাতীয় ময়লা দেখলাম। এরপরও ছেড়াদ্বীপের কারণেই এখনও মানুষ সেন্টমার্টিন যায় এখনো কারণ আসল প্রাকৃতিক প্রবালদ্বীপের ছোঁয়া এখনো সেখানে পাওয়া যায়। আমরা তিনজন যখন সকাল সাড়ে ৬ টার দিকে ছেড়াদ্বীপ যাই তখন কোন জনমানব সেখানে ছিল না, অদ্ভুত এক নীরবতা ভেদ করে শুধু সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন শোনা যাচ্ছিল। যাই হোক সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে আমরা ছেড়াদ্বীপ ভ্রমণ শেষ করে আবার রিসোর্টে ফিরে আসি। এরপর সকালের খাবার খেয়ে ১০ টার দিকে আরেকটি রোমাঞ্চকর স্পিডবোট ভ্রমণ করে আমরা টেকনাফ ফিরে আসি।
 
এরপর দুইদিন আমরা কক্সবাজার বেড়িয়ে ঢাকা চলে আসি। এই লেখায় লাইক ভাল পড়লে খুব সস্তায় কিন্তু আরামে কক্সবাজার ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করব।
 
Writer: Ranjan Sarker
Comments